কাজী নজরুল ইসলামের জীবন বৃত্তান্ত

5/5 - (1 vote)

কাজী নজরুল ইসলাম মানেই বিদ্রোহের দাবানল, কাজী নজরুল ইসলাম মানেই একজন ইসলামি সঙ্গীতের অফুরন্ত ভান্ডার ,কাজী নজরুল ইসলাম মানেই দরিদ্রের কষাঘাতে বেড়ে ওঠা একজন দুরন্ত কিশোরের গল্প।

কাজী নজরুল মানেই একজন সৈনিক, নজরুল মানেই একজন দেশপ্রেমিক। নজরুল মানেই সামাজিক অনাচার ও শোষণের বিরুদ্ধে এক সোচ্চার ও প্রতিবাদি কন্ঠ। কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম অগ্রণী বাঙালি কবি, নাট্যকার,ঔপন্যাসিক, সঙ্গীতজ্ঞ, সাংবাদিক ও দার্শনিক।

কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী
কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী

কাজী নজরুল ইসলামের সংক্ষিপ্ত বায়োডাটা

নামকাজী নজরুল ইসলাম
ছোটবেলার ডাকনাম“দুখু মিঞা”
ছদ্মনামনুরু
নরু
ধূমকেতু
তারাক্ষাপা
নজরুল এছলাম
মোহম্মদ লোক হাসান”
বাগনান
কহ্লন মিশ্র
জন্ম২৪শে মে ১৮৯৯, চুরুলিয়া, ব্রিটিশ ভারত (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ)
পিতাকাজী ফকির আহমদ
মাতাজাহেদা খাতুন
দাম্পত্য জীবন সঙ্গীপ্রমিলা দেবী
নার্গিস আসার খানম
পেশাকবি, ঔপন্যাসিক, গীতিকার, সুরকার, নাট্যকর ও সম্পাদক
উল্লেখযোগ্য রচনাবলী সমগ্রনজরুলগীতি, অগ্নিবীণা, বাঁধন হারা, বিষের বাঁশি প্রভৃতি
ধর্মইসলাম
জাতীয়তাব্রিটিশ ভারত ব্রিটিশ ভারতীয় (১৮৯৯–১৯৪৭)
ভারতীয় (১৯৪৭–১৯৭৬)
বাংলাদেশী (১৯৭২ -)
মৃত্যু২৯ আগস্ট ১৯৭৬ (বয়স ৭৭) ঢাকা, বাংলাদেশ

আরো পড়ুনঃ


স্বামী বিবেকানন্দের জীবন বৃত্তান্ত

মাদার টেরেসার জীবন বৃত্তান্ত

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের জীবন বৃত্তান্ত

সত্যজিৎ রায়ের জীবন বৃত্তান্ত

জগদীশ চন্দ্র বসুর জীবন বৃত্তান্ত

হুমায়ুন আজাদের জীবন বৃত্তান্ত

কাজী নজরুল ইসলামের প্রাথমিক জীবন


কাজী নজরুল ইসলাম বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার অন্তর্গত চুরুলিয়া গ্রামে ২৪শে মে ১৮৯৯ সালে জন্মগ্রহন করেন ।কাজী নজরুল ইসলাম ছোটবেলায় অনেক দুঃখ- কষ্টের মধ্যে দিয়ে বড় হয়েছেন বলে তিনি দুখু মিয়া নামেও অধিক পরিচিত ছিলেন। কাজী নজরুল ইসলামের বাবার নাম কাজী ফকির আহমদ এবং মাতার নাম জাহেদা খাতুন। কাজী নজরুল ইসলামের পারিবারিক অবস্থা খুব খারাপ ছিল। নজরুলের বাবার পক্ষে শুধু ইমামতি করে সংসার চালানো খুব কঠিন ছিল।

কাজী নজরুল ইসলামের বয়স যখন মাত্র নয় বছর তখন তার বাবা মারা যান। তাইতো জীবন ও জীবিকার তাগিদে কাজী নজরুল ইসলাম কখনো হোটেলে আবার কখনো দিন মজুর হিসেবে কাজ করেছেন। কাজী নজরুল ইসলাম গ্রামের স্থানীয় মসজিদে মুয়াজ্জিন হিসেবে কাজ করেও জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেছেন। তবে শত ব্যস্ততার মাঝেও থেমে ছিলনা কাজী নজরুল ইসলামের দুরন্তপনা। ছোটবেলা থেকেই গান-বাজনা,নাটক ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি অসম্ভব ঝোঁক ছিল কাজী নজরুল ইসলামের।

কাজী নজরুল ইসলামের শিক্ষা জীবন


কাজী নজরুল ইসলামের শিক্ষা জীবন খুব অল্প পরিসরের হলেও তার জ্ঞানের পরিধি ছিল বিশাল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তার কলম যে লেখনি ধারণ করেছিল তা হয়ত বাংলা সাহিত্যের আর কোন লেখকের কলমের পক্ষে সম্ভব হয়নি আর হবেও না কখনো । দারিদ্রের কষাঘাতের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলাম তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু করেন গ্রামের মসজিদ কতৃক পরিচালিত ধর্মীয় স্কুলে। সেখানে তিনি একাধারে ইসলাম ধর্ম, এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান লাভ করেন এবং এই ধর্মীয় স্কুল থেকেই নজরুল নিম্ন মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

কিন্তু তার পিতা মারা যাওয়ার কারণে শিক্ষা অর্জনের এই ধারাবাহিকতা তিনি ধরে রাখতে পারেন নি। ফলে সংসার চালানোর জন্য তিনি উক্ত মক্তবেই শিক্ষকতা শুরু করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি মুয়াজ্জিন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অতি অল্প বয়সেই ইসলামিক কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখার সুবাদে নজরুল ইসলামিক আচার ও ইসলামিক জ্ঞানে পান্ডিত্য লাভ করেন। যার প্রতিফলন আমরা তার রচিত বিভিন্ন ইসলামিক গল্প,উপন্যাস ও কবিতায় দেখতে পাই।

কিন্তু দুরন্ত নজরুল খুব বেশিদিন এই কাজের সাথে নিজেকে যুক্ত রাখতে পারেননি। গান,বাজনা,নিত্য ও অভিনয়ের প্রতি অসম্ভব টান ছিল নজরুলের। তাইতো এগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে নজরুল লেটো নাট্যদলে যোগদান করেন। এই লেটো নাট্যদলের সাথে তিনি বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করতেন এবং নাচ গান শিখতেন। এই লেটো দলে থাকা অবস্থায় কাজী নজরুল ইসলাম সাহিত্য চর্চায় মনোনিবেশ করেন। বলা যায় এই লেটো দলে অবস্থানকালেই কাজী নজরুলের সাহিত্যে হাতে খড়ি হয়।

কাজী নজরুল এই লেটো দলে থাকা অবস্থায় অনেক লোকসঙ্গীত রচনা করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল আকবর বাদশাহ,রাজপুত্রের গান,কবি কালিদাস,বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ ইত্যাদি।একসময় লেটো দল ছেড়ে দেন কাজী নজরুল ইসলাম এবং ১৯১০ সালে নতুন করে শিক্ষা জীবন শুরু করেন। কাজী নজরুলের ছাত্রজীবনে প্রথম স্কুল ছিল রাণীগঞ্জের সিয়ারসোল রাজ স্কুল এবং দ্বিতীয় স্কুল ছিল মাথরুন উচ্চ ইংরেজি স্কুল। কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত নজরুল ষষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করে আবারো জীবিকার সন্ধানে বেড়িয়ে পরেন।

কাজী নজরুল ইসলামের সৈনিক জীবন


কাজী নজরুলের পেশাগত জীবন ছিল বইচিত্রময়। কাজী নজরুল একেক সময় একেক ধরণের পেশার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেছেন। কাজী নজরুল ১৯১৭ সালের শেষদিকে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন এবং দীর্ঘ প্রায় আড়াই বছর ৪৯ বেঙ্গল রেজিমেন্টের সাধারণ সৈনিক কর্পোরাল ও কোয়ার্টার মাস্টার হাবিলদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সেনানিবাসে অবস্থানকালেই নজরুল ফার্সি ভাষা আয়ত্ত করে ফেলেন এবং গদ্য-পদ্যের চর্চায় নিজেকে ব্যাস্ত রাখেন। সেনানিবাসে লিখিত তার রচনাগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল মুক্তি (প্রথম কবিতা),বাউণ্ডুলের আত্মকাহিনী (প্রথম গদ্য);গল্প: ব্যথার দান, ঘুমের ঘোরে,হেনা, মেহের নেগার,কবিতা সমাধি ইত্যাদি। ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে কাজী নজরুল ইসলাম সৈনিক জীবন ত্যাগ করে কলকাতায় ফিরে আসেন।

কাজী নজরুল ইসলামের সামরিক কর্মজীবন

আনুগত্যব্রিটিশ সাম্রাজ্য
সার্ভিসব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনী
কার্যকাল১৯১৭–১৯২০
পদমর্যাদাহাবিলদার
ইউনিট৪৯তম বেঙ্গল রেজিমেন্ট
যুদ্ধপ্রথম বিশ্বযুদ্ধ

কাজী নজরুল ইসলামের সাংবাদিক/কর্ম জীবন


সৈনিক জীবনের ইতি টানার পর কাজী নজরুল ইসলাম কলকাতায় এসে সাংবাদিক ও সাহিত্যিক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং অল্প দিনের মধ্যেই তার লেখনিগুলো প্রশংসিত হতে থাকে। তার প্রাথমিক লেখনিগুলোর মধ্যে অন্যতম হল উপন্যাস; বাঁধন হারা,এবং কবিতা শাত-ইল-আরব,বোধন,আগমনী, খেয়া-পারের তরণী,মোহরর্‌ম, কোরবানি ইত্যাদি।

তার এই লেখনিগুলো প্রকাশিত হত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা, ই মোসলেম ভারত ও উপাসনা পত্রিকায়। এরপর কাজী নজরুল ইসলামকে আর পিছে তাকাতে হয়নি। তার লেখনির জনপ্রিয়তা তাকে পরিচয় করিয়ে দেয় সে সময়ের বিখ্যাত সব লেখক ও সাহিতসাহিত্যিকদের সাথে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌,কাজী মোতাহার হোসেন, মোজাম্মেল হক ও কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখ।এরপর কাজী নজরুল ১৯২১ সালে শান্তিনিকেতনে যেয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের সাথে সাক্ষাৎ করেন।

কাজী নজরুল ইসলামের বৈবাহিক জীবন


১৯২১ সালে কাজী নজরুল ইসলাম আলী আকবর খানের সাথে কুমিল্লার বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে আসেন। আলী আকবর খান ছিলেন মুসলিম সাহিত্য সমিতির অফিসে গ্রন্থ প্রকাশক। বিরজাসুন্দরী দেবীর বাড়িতে এসে কাজী নজরুলের পরিচয় ঘটে প্রমীলা দেবী নামের এক রূপসী মেয়ের সাথে এবং তার সাথে নজরুলের প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে।

প্রেমের এই সম্পর্ক এক সময় বৈবাহিক সম্পর্কে রুপ নেয় যদিও এই বিয়ের আগে নজরুলের বিয়ের কথা ছিল নার্গিস আসার খানমের সাথে। নার্গিস আসার খানম ছিলেন আলী আকবর খানের ভগ্নী। কিন্তু কাজী নজরুল ঘর জামাই থাকতে অস্বীকার করায় বিয়েটা ভেঙ্গে যায়।

কাজী নজরুল ইসলামের উপাধি

*বিদ্রোহী কবি
*বুলবুল
*সাম্যবাদী কবি
*মানুষের কবি
*যুগের কবি
*গাজী আব্বাস বিটকেল
*ব্যাঙাচি কবি
*মৈত্রীর কবি
*হাবিলদার কবি

কাজী নজরুল ইসলামের জনপ্রিয় উক্তি

“অন্ধের মতো কিছু না বুঝিয়া, না শুনিয়া, ভেড়ার মতো পেছন ধরিয়া চলিও না । নিজের বুদ্ধি, নিজের কার্যশক্তিকে জাগাইয়া তোলে ।”

“বহু যুবককে দেখিয়াছি যাহাদের যৌবনের উর্দির নিচে বার্ধকের কঙ্গাল মূর্তি।”

“আমি এই দেশে, এই সমাজে জন্মেছি বলেই শুধু এই দেশের, এই সমাজেরই নই, আমি সকল দেশের সকল মানুষের।”

“নুড়ি হাজার বছর ঝরণায় ডুবে থেকেও রস পায় না।”

“আর্থ দিয়ে মাড়োয়ারিকে, জমিদার, মহাজনকে বা ভিখারিকে হয়তো খুশি করা যায়, কিন্তু কবিকে খুশি করা যায় না ।”

“সত্যকে অস্বীকার করিয়া ভশ্তামি দিয়া কখনো মঙ্গল উৎসবের কল্যাণ প্রদীপ জ্বলিবে না।”

“ব্যর্থ না হওয়ার সব চাইতে নিশ্চিন্ত পথ হলো সাফল্য অর্জনে দৃঢ় সঙ্কল্প হওয়া।”

“নারীর বিরহে নারীর মিলনে নর পেলো কবি প্রাণ যত কথা তার হইল কবিতা শব্দ হইল গান।”

“কোনকালে একা হয়নিকো জয়ী, পূরুষের তরবারী; প্রেরনা দিয়েছে, শক্তি দিয়াছে, বিজয়ালক্ষী নারী।”

“গিন্নির চেয়ে শালী ভালো ”

“ভালবাসার কোন অর্থ বা পরিমাণ নেই ”

“মিথ্যা শুনিনি ভাই, এই হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দীর-কাবা নাই।”

কাজী নজরুল ইসলামের মৃত্যু


১৯৪২ সালে আমাদের সবার প্রিয় কবি নজরুল বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেন এবং তাঁর মানসিক অবস্থা দিন দিন খারাপ হতে থাকে ।কাজী নজরুলের মানুষিক অবস্থার উন্নতির আশায় তাকে ১৯৫২ সালে রাঁচির একটি মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কিন্তু এতে কোন কাজ হয়নি।

দিন দিন কাজী নজরুলের অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকে এবং এমন অবস্থাতেই ১৯৭২ সালে কবিকে বাংলাদেশে আনা হয় এবং ১৯৭৬ সালে তাকে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দেয়া হয়। অবশেষ ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট আমাদের সবার প্রিয় দুখু মিয়া পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোক গমন করেন।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.